Sponser

বিশ্বের একমাত্র প্রাণী, যাদের পুরুষরা গর্ভধারণ করে

বিচিত্র পৃথিবী
PUBLISHED: April 21, 2020

প্রাণীটির নাম সি হর্স বা হিপোক্যাম্পাস। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের অগভীর সমুদ্রে এই প্রাণীটিকে দেখতে পাওয়া যায়। হিপোক্যাম্পাস শব্দটা এসেছে গ্রীক শব্দ hippokampos থেকে। hippos মানে horse আর kampos মানে sea monster। সি হর্সের মুখ আর গলা ঘোড়ার মতো। মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর ভঙ্গিমা, আঁকড়ে ধরার ক্ষমতাযুক্ত বাঁকানো লেজ দেখলেই সমীহ জাগে মনে। কিন্তু একে সমুদ্র-ঘোড়া বা সিন্ধুঘোটক বলা যাবে না। কারণ, আগে থেকেই সে নাম নিয়ে বসে আছে ওয়ালরাস (Walrus)।

সি হর্স একটি সামুদ্রিক মাছ!

সি হর্স হল Actinopterygii পরিবারভুক্ত একটি মেরুদণ্ডী প্রাণী। মাছ বলা হয়, কারণ এরা মাছের মতোই কানকোর মাধ্যমে শ্বাসকার্য চালায়। তাই ইচ্ছা করলে সি হর্সকে ঘোড়া-মাছ বলতে পারেন, মাছের সঙ্গে মিল না থাকলেও। এদের চারটি পাখনা আছে। লম্বা লেজের পিছন দিকে একটি, পেটের ঠিক নীচে একটি, অন্য দু’টি চোয়ালের দুই পাশে। সি হর্স প্রতি সেকেন্ডে ৫০ বার পাখনাগুলি নাড়তে পারে। পাখনা থাকলেও সি হর্স অন্যান্য মাছের মতো দ্রুত চলাচল করতে পারে না গঠনগত কারণে।

সি হর্স অস্থিযুক্ত মাছ, কিন্তু এদের দেহে আঁশ নেই। তার বদলে চামড়ার আবরণে ঢাকা হাড়ের শক্ত রিং আছে দেহকে ঘিরে। প্রতিটি প্রজাতির সি হর্সে এই রিং এর সংখ্যা আলাদা। পৃথিবীতে প্রায় ৪৭ প্রজাতির সি হর্স পাওয়া যায়। সবচেয়ে বড় প্রজাতির সি হর্সের নাম ‘হিপোক্যাম্পাস অ্যাবডমিনালিস’, এরা প্রায় এক ফুটের মতো লম্বা হয়। সবচেয়ে ছোট প্রজাতির সি হর্সের নাম ‘হিপোক্যাম্পাস সাতোমিয়ে’, এই সি-হর্সগুলি মাত্র আধ ইঞ্চি লম্বা। প্রাকৃতিক পরিবেশে সি হর্সরা সাধারণত ১ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত বাঁচে।

সি হর্স
কিছু অবাক করা তথ্য

● সি হর্সরা শব্দ সৃষ্টি করতে পারে। ছেলেবেলায় আমরা যেভাবে ঠোঁট উল্টে স্কুটার বা মোটর সাইকেলের আওয়াজ করি, সি হর্সরাও জলের তলায় সেরকম আওয়াজ করে। খাওয়ার ও প্রেমের সময়।
● সি হর্স হলো একমাত্র প্রজাতির মাছ যারা লেজ দিয়ে কোনও কিছু আঁকড়ে ধরতে পারে।
● সি হর্সরা গিরগিটির মতো রঙ পালটায়। আত্মরক্ষার সময় বা সঙ্গিনীকে আকৃষ্ট করতে।
●সি হর্সের দেহে পাকস্থলী নেই। যেহেতু এদের পাকস্থলী নেই, তাই খাবার খুব দ্রুত হজম হয়ে কোষে কোষে পৌঁছে যায়। ফলে সি হর্সদের ঘন ঘন খেতে হয়। অতি ক্ষুদ্র চিংড়ি এদের প্রিয় খাবার।

‘তুমি যে আমার, ওগো তুমি যে আমার’।
সি হর্সদের জীবনে আছে প্রেমও

সারা প্রজনন ঋতু পুরুষ সি হর্স কাটায় এক প্রেমিকাকে নিয়েই। এমনিতে এরা খুব ভীতু। সারাক্ষণ ভয়ে ভয়ে থাকে। এই বুঝি কেউ খেয়ে ফেলল। ভালো সাঁতারও কাটতে পারে না। ফলে দূরে গিয়ে সঙ্গী বা সঙ্গিনী খোঁজা কঠিন। তাই সঙ্গী বা সঙ্গিনী কাছে বিশ্বস্ত থাকে সি হর্সেরা। প্রজনন ঋতুতে অনেক বেশি শাবকের জন্ম দিতে পারে। প্রত্যেকদিন নিয়ম করে তারা সোহাগ জানায় একে অপরকে। সোহাগ জানায় আদর করে, নাচ দেখিয়ে, রঙ পরিবর্তন করে। সারাদিনের জন্য আলাদা হয়ে যাওয়ার আগে, কিছুক্ষণ তারা একসঙ্গে একটু ঘুরেও নেয়, গালে গাল লাগিয়ে।

রীতিমত প্রেমপর্ব চলে সঙ্গমের আগে। মিলনের আগে সি হর্স দম্পতি বেশ কয়েকদিন ধরে প্রেমপর্ব চালায়। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন, এই প্রাক-সঙ্গমপর্বে পুরুষ ও স্ত্রী সি হর্সের শুক্রাণু ও ডিম্বাণু সুপুষ্ট হয়। এই সময় তাদের দেহের রঙ ঘন ঘন পরিবর্তিত হতে থাকে। একে অপরের লেজ আঁকড়ে জলে পাশাপাশি সাঁতার কাটতে থাকে। যেন প্রেমিক প্রেমিকা হাত ধরে সান্ধ্যভ্রমণে বেরিয়েছে। কখনও জলের নিচের একই ঘাসকে দুজনে আঁকড়ে ধরে পরস্পরকে আদর করতে থাকে নাচের ভঙ্গিমায়। মিলনের আগে এই প্রেমপর্ব চলে প্রায় আট ঘন্টা। এই সময় পুরুষ সি হর্স তার পেটের থাকা থলি ‘ব্রুড পাউচ’টির (brood pouch) ভেতরে জল ঢুকিয়ে নিয়ে থলিটি পরিষ্কার করে নেয়। তাকে গর্ভধারণ করতে হবে যে।

লেজে লেজ পাকিয়ে শুরু হয় প্রেম।
তারপর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ

সি হর্স দম্পতি দুজন একই ঘাসকে আঁকড়ে নিজেদের নোঙর করে। তারপর একে অপরকে পেঁচিয়ে শুরু হয় সঙ্গম। উভয়ের শরীরে কম্পন দেখা দেয়। স্ত্রীটি তার ‘ওভিপজিটর’ নালি ঢুকিয়ে দেয় পুরুষের ‘ব্রুড পাউচ’ নামের থলিটির মধ্যে। মাত্র ৬ সেকেন্ডের মধ্যে স্ত্রী সি হর্স তার পুরো ডিম্বাণু ঢেলে দেয় পুরুষের থলির মধ্যে। থলির ভেতর থাকে সমুদ্রের জল। পুরুষটি এবার সেই জলের ভেতর শুক্রাণু ছেড়ে দেয়।

শুক্রাণুর সঙ্গে ডিম্বাণুর মিলন হয়। তৈরি হয় ভ্রূণ। স্ত্রী সি হর্সের শরীর স্লিম হয় পুরুষ সি হর্সের পেট ফুলতে থাকে। ভাবছেন কাজ শেষ, এবার স্ত্রী সি হর্স কদিন মনের সুখে ফুর্তি করবে খেয়ে ও ঘুরে। না, সঙ্গীকে ছেড়ে দূরে যায় না স্ত্রী সি হর্স। পরকীয়াতেও মাতে না। বরং অপেক্ষা করে কখন তার পুরুষ সঙ্গী সন্তান প্রসব করবে। আবার প্রেম ফিরবে দুজনের জীবনে। একবার মিলনে আবদ্ধ হলে এরা কখনই একে অন্যকে ছেড়ে যায় না।

প্রেম পরিণতি পেল মিলনে।

পুরুষ করবে গর্ভধারণ

প্রজাতি ভেদে ৯ থেকে ৪৫ দিন গর্ভধারণ করে পুরুষ সি হর্সরা। পুরুষটি গর্ভধারণ কালে ৩৩% বেশি অক্সিজেন নেয়। বেশি খাবার খায়। পুরুষটির গর্ভধারণকালে স্ত্রী সি হর্স প্রতিদিন সকালে একবার করে পুরুষ সঙ্গীকে দেখতে আসে। আদর করে, খাবার খুঁজে নিয়ে এসে পুরুষটিকে খেতে দেয়। ডিমগুলো থলিতে নিয়ে পুরুষ সি হর্স খুব সাবধানে চলাফেরা করে। কোনও জলজ উদ্ভিদ বা পাথরের উপর বসে কাটিয়ে দেয় দিন ও রাতের বেশিরভাগ সময়। থলির ভেতর বাড়তে থাকা ছানাগুলোর যাতে কোনো কষ্ট না হয়। পুরুষের শরীর থেকেই প্রয়োজনীয় পুষ্টি আর অক্সিজেনই নিয়ে বাড়তে থাকে সি হর্সের ছানাপোনারা। বাবা সি হর্সের উদর ক্রমশ বড় হতে থাকে।

প্রসবের অপেক্ষায় পুরুষ সি হর্স

ব্রুড পাউচে থাকা শিশু সি হর্সগুলি প্রসবের উপযোগী হয়ে গেলে, পুরুষ সি হর্স সন্তান প্রসব করে। প্রজাতি ভেদে ১০০ থেকে ১০০০টি পর্যন্ত সন্তান প্রসব করে পুরুষ সি হর্সেরা। সন্তানদের নিরাপত্তার স্বার্থে পুরুষ সি হর্স প্রসব করে রাতের অন্ধকারে। তবুও প্রসব করা শিশু সি হর্সগুলির মধ্যে মাত্র ০-০.৫% বাচ্চা পূর্ণবয়স্ক হতে পারে। খাদক প্রাণী, জলের স্রোত, উষ্ণতা বাকি শিশু সি হর্সগুলির আয়ু কেড়ে নেয়।

প্রসব করছে পুরুষ

শাবকদের জলে ছেড়ে দিয়ে পুরুষটি যখন একটু হাঁফ ছাড়বার কথা ভাবে, তখনই লেজ দোলাতে দোলাতে গদগদ ভঙ্গিতে এগিয়ে আসে ঘাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সঙ্গিনী। পুরুষটি হয়ত মনে মনে বলে, আবার! কিন্তু যেহেতু বাধ্য স্বামী, তাই কপালের দুঃখ এড়াতে আবার নতুন করে শুরু করতে হয় সোহাগ পর্ব। কারণ পুরুষটি জানে, প্রেম বড় মধুর, কভু কাছে কভু সুদূর।

লেখকঃ রূপাঞ্জন গোস্বামী

Recommended For You

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *